বর্ণবৈষম্য, মানসিক চাপ: ভারতের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইআইটিতে বাড়ছে আত্মহত্যা
আপলোড সময় :
১১-০৩-২০২৬ ০৮:৩৫:৩৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১১-০৩-২০২৬ ০৮:৩৫:৩৭ অপরাহ্ন
বর্ণবৈষম্য, মানসিক চাপ: ভারতের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইআইটিতে বাড়ছে আত্মহত্যা
নিজস্ব প্রতিবেদক
গত দুই দশকে ভারতের শীর্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্তত ১৬০ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে গত পাঁচ বছরেই ৬৯ জন আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
ভারতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ইন্ডিয়ান ইনিস্টিটিউটস অব টেকনোলোজি (আইআইটি)—এর সাফল্যের গল্পের আড়ালে ক্রমেই সামনে আসছে মানসিক চাপ, প্রতিযোগিতা এবং বৈষম্যের কঠিন বাস্তবতা।
একটি ফোনকলের অপেক্ষা
মহারাষ্ট্রের ছোট শহর না–এ অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় সঞ্জয় নেরকার প্রায় প্রতিদিনই এক ফোনকলের অপেক্ষা করেন।
একসময় প্রতিদিন সন্ধ্যায় তার ছেলে বরাদ নেরকার তাকে ফোন করত।
৫৫ বছর বয়সী এই সরকারি কর্মচারী স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, সে বলত—
‘পাপা, শুধু আপনার কণ্ঠটা শুনতে ইচ্ছে করছিল।’
কিন্তু দু’বছর আগে সেই রুটিন ভেঙে যায়। স্বপ্ন পূরণ… তারপর ট্র্যাজেডি
২০২২ সালে বরাদ তার ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ করে—ভারতের ২৩টি আইআইটির একটিতে ভর্তি হয়।
এর মধ্যে সাতটি ‘লিগ্যাসি আইআইটি’, যেগুলো ২০০০ সালের আগে প্রতিষ্ঠিত এবং সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
বরাদ ভর্তি হয় ইন্ডিয়ান ইনিস্টিটিউটস অব টেকনোলোজি দিল্লী (আইআইটি দিল্লি)–তে এমটেক প্রোগ্রামে।
তার বাবা বলেন, ‘সে সেখানে বিটেক পায়নি, কিন্তু হাল ছাড়েনি। যখন এমটেকের ফল বের হলো, আমরা মিষ্টি বিতরণ করেছিলাম। মনে হয়েছিল এটা শুধু তার নয়, পুরো পরিবারের স্বপ্ন।’
কিছুক্ষণ থেমে তিনি বলেন, ‘যদি জানতাম আইআইটি দিল্লি আমার কাছ থেকে কী কেড়ে নেবে, তাহলে কখনো তাকে সেখানে পাঠাতাম না।’
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বরাদ আত্মহত্যা করে মারা যায়। তখন তার বয়স ছিল ২৬ বছর।
মৃত্যুর কয়েকদিন আগে সে তার মাকে জানিয়েছিল তীব্র একাডেমিক চাপ এবং সুপারভাইজারের চাপের কথা।
কেন আইআইটির এত গুরুত্ব?
ভারতে আইআইটিতে ভর্তি হওয়া শুধু ভালো শিক্ষা নয়—এটি সামাজিক মর্যাদার প্রতীক।
ভর্তি প্রতিযোগিতা
২০২৫ সালে—
প্রায় ১৩ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নেয় জয়েন্ট এন্ট্রেন্স এক্সামিনেশন মেইন (জেইই মেইন) পরীক্ষায়
এর মধ্যে ২.৫ লাখ শিক্ষার্থী যোগ্যতা পায় জয়েন্ট এন্ট্রেন্স এক্সামিনেশন এডভান্সড (জেইই অ্যাডভান্সড) পরীক্ষার জন্য, কিন্তু আইআইটিতে বিটেক আসন মাত্র ১৮ হাজার। অর্থাৎ—
বিটেক ভর্তি হার প্রতি ৭২ জনে মাত্র এক জন
এদিকে এমটেকের জন্য—
প্রায় আট থেকে ১০ লাখ শিক্ষার্থী দেয় গ্রেজুয়েট এপটিটিউড টেস্ট ইন ইনঞ্জিনিয়ারিং (গেট)
ভর্তি সুযোগ পায় মাত্র ৮৫০০ জন। অর্থাৎ— এমটেক ভর্তি হার প্রতি ১১৭ জনে মাত্র এক জন।
আইআইটির সাফল্যের গল্প
আইআইটি থেকে পড়াশোনা করে বের হয়েছেন বিশ্বের অনেক শীর্ষ প্রযুক্তি নেতারা, যেমন—
সুন্দর পিচাই — সিইও, গুগল
অরভিন্দ কৃঞ্চ — সিইও, আবিএম
আইআইটি গ্র্যাজুয়েটদের গড় বেতন যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় ২১৬,০০০–২৩৫,০০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
বাস্তবতার অন্য দিক
সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি রয়েছে তীব্র চাপ ও প্রতিযোগিতা।
২০২৪ সালে আইআইটি থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৮ শতাংশ কোনো চাকরি পায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
আইআইটিগুলো সাধারণত শুধু উচ্চ বেতনের চাকরির খবর প্রচার করে, কিন্তু যারা চাকরি পায় না তাদের কথা খুব কমই বলা হয়।
‘তারা আমার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে গেছে’
এই ১৬০ আত্মহত্যার মধ্যে একজন ছিল দর্শন সোলাঙ্কি, বয়স মাত্র ২০ বছর।
তার বাবা রমেশ সোলাঙ্কি, আহমেদাবাদের একজন প্লাম্বার।
দর্শন ভর্তি হয়েছিল ইন্ডিয়ান ইনিস্টিটিউটস অব টেকনোলোজি বোম্বে–এ কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে।
তার বাবা বলেন, ‘ও বলেছিল— ‘পাপা, আমি পেরেছি। এখন আমাদের জীবন সহজ হবে।’
কিন্তু পড়াশোনা শেষ করার আগেই সে মারা যায়।
পরিবারের অভিযোগ—
দর্শন তার দলিত (নিম্নবর্ণ) পরিচয়ের কারণে অপমান ও বিদ্রূপের শিকার হতো।
ভারতের কাস্ট ব্যবস্থা এখনো অনেক জায়গায় বৈষম্যের কারণ।
তার বাবা বলেন, ‘আমরা নিম্নবর্ণের। তাই বলে কি আমাদের সন্তান অপমান সহ্য করবে?
অপমান আর পড়াশোনার চাপ—একটি ২০ বছরের ছেলে কীভাবে দুটো সামলাবে?’
গবেষকদের জন্য আরেক সংকট
আইআইটিতে পিএইচডি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় চাপ। অনেক ক্ষেত্রে—ফেলোশিপ ৫ বছর পরে বন্ধ হয়ে যায়
থিসিস অনুমোদন অনেক সময় একজন সুপারভাইজারের হাতে নির্ভর করে
একজন পিএইচডি শিক্ষার্থী বলেন:
“অনেক সুপারভাইজার অত্যন্ত বিষাক্ত আচরণ করেন। এতে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।”
২০২৫ সালে আইআইটি ঘোষণা করে—
৭ বছরের মধ্যে পিএইচডি শেষ না হলে ভর্তি বাতিল হতে পারে।
সম্প্রতি ইন্ডিয়ান ইনিস্টিটিউটস অব টেকনোলোজি কানপুর–এ পিএইচডি শিক্ষার্থী রামস্বরূপ ইসরাম আত্মহত্যা করেন।
তিনি হোস্টেলে তার স্ত্রী ও দুই বছরের মেয়ের সঙ্গে থাকতেন।
ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করলেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
সমাধান কী?
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট -এর নির্দেশে গঠিত ন্যাশনাল টাস্কফোর্স আন মেন্টাল হেলথ এই সংকট নিয়ে কাজ করছে।
সাবেক বিচারপতি এস রবিন্দ্র ভাট বলেন, ‘পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হাজার হাজার অভিযোগ আমরা পেয়েছি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে—
আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব, শুধু কাউন্সিলর নিয়োগ করলেই হবে না
প্রতিষ্ঠানকে প্রোঅ্যাকটিভভাবে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করতে হবে
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞি আকাশ শেখ বলেন, ‘যেসব শিক্ষার্থী মারাত্মক মানসিক চাপে থাকে, তারা সাধারণত নিজেরা সাহায্য চাইতে আসে না। প্রতিষ্ঠানগুলোকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে।’
নিউজটি আপডেট করেছেন : NewsUpload
কমেন্ট বক্স